Articles

শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য








ড. হুসাইন আহমাদ





সম্পাদনা : ড. মোঃ আবদুল কাদের








শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য





আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অথচ বর্তমান বিশ্বের অসংখ্য শিশু মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন প্রকার অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অপুষ্টি ও নানা প্রকার রোগ-শোকে ভুগছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার তথা অন্ন বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা ও শিক্ষার অধিকার অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অত্যাচার-নির্যাতন ও অমানুষিক শিশু শ্রমের কারণে সম্ভাব্য কুঁড়ি অকালেই ঝরে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও কোন কোন ক্ষেত্রে শিয়াল কুকুরের সাথে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া খাবারে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ অংশগ্রহণ করছে। এ অধিকার বঞ্চিত মানুষ অন্যায়-অত্যাচার মাদকাশক্তি ও সন্ত্রাসের মত জঘন্যতম কাজে জড়িয়ে সমাজে সমস্যা সৃষ্টি করছে। অথচ সামান্য সচেতন হলে সকল সম্ভাবনা আশ্রয় ও শিশুদের সম্পদে পরিণত করা যায়। নবজাতক শিশু ফলবান বৃক্ষের সাথে তুল্য। একটি চারাকে উত্তমরূপে পরিচর্যা করলে যেমন মজবুত কান্ড ও পত্র পল্লবে সুশোভিত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হয়ে কাংঙ্ক্ষিতরূপে ফলদান করতে সক্ষম হয়। তেমনি উত্তমরূপে পরিচর্যা করলে প্রতিটি শিশু সুস্থ্য সবল এবং সুঠাম দেহের অধিকারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যাদের দ্বারা আমরা আগামী দিনে সোনালী ভবিষ্যৎ গড়তে পারি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাতৃগর্ভ থেকে শিশু অধিকার নিশ্চিত করা। তাছাড়া শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যাপারে মাতৃদুগ্ধদানের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য শীর্ষক প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুসারে এ প্রবন্ধটি যথার্থ নির্বাচন। এ প্রবন্ধ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও উৎসাহী করবে ইনশাল্লাহ।





মানব সভ্যতায় পিতা-মাতা ও সন্তানের পারস্পারিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, তাছাড়া পারস্পারিক গ্রহণযোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য অধ্যাধিক। তাই শৈশব থেকে সন্তানকে প্রাপ্য অধিকার প্রদান ও উত্তর আচার-আচারণের দ্বারা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেননা মানব সন্তানের শৈশব হল কাঁদা মাটির ন্যায়, শৈশবে তাকে যেমন ইচ্ছা তেমন গড়ে তোলা যায়। স্থায়ীত্ব ও প্রভাব বিস্তারের দিক থেকেও শৈশবকালীন শিক্ষা মানব জীবনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। শৈশবকালীন শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে:





العلم في الصغر كالنقش على الحجر.





‘‘শৈশবে বিদ্যার্শন (স্থায়ীত্বের দিক থেকে) পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যের ন্যায়।’’[1] ইসলাম চৌদ্দশ বছরের অধিককাল যাবত শিশুদের বিষয় গুরুত্বারোপ করে আসছে এবং শিশু পরিচর্যার বিষয়টিকে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করত তাকে একটি সার্বক্ষণিক পালনীয় বিধানে পরিণত করেছে। ইসলাম যে শিশুর জন্ম মূর্হুত থেকেই তার অধিকারের কথা ঘোষণা করেছে তা নয়, বরং তার জন্মের পূর্ব থেকেই তার অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে শৈশব হচ্ছে সৌন্দর্য, আনন্দ, সৌভাগ্য ও ভালবাসার পরিপূর্ণ এক চমৎকার জগত। সন্তানকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যের ঘোষণা পবিত্র কুরআনে এসেছে,





‘‘ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হচ্ছে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য বিশেষ।’’(সূরা কাহাফ:)[2] সুতরাং পার্থিব জীবনের সুখ শান্তি ও সৌন্দর্য এ শিশুকে ভবিষতে সম্পদ হিসেবে গড়ি তোলার জন্যে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা করা একান্ত প্রয়োজন। পিতা-মাতার উপর সন্তানের অনেকগুলো অধিকার রয়েছে।





বৈধভাবে জন্মগ্রহণ করার অধিকার





জন্মগত বৈধতা ইসলামের পরিবার গঠনের ভিত্তি এবং শিশুর ন্যায্য অধিকার। অবৈধ সন্তান না হবার জন্য নানারূপ সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে, এ ক্ষেত্রে অবৈধ যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অবৈধ যৌনমিলনের ফলে মাবনদেহে নানারকম রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়। উপরন্ত এতে অবৈধ সন্তান জন্মের আশংকা থাকে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, অবৈধ সন্তান মানবিক অধিকার হতে অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয় এবং তার জীবন ধারণ ও লালন পালনের সুযোগ-সুবিধা সহজলভ্য হয় না। যদিও পিতা-মাতার অপরাধ সন্তানের উপর বর্তায় না তবুও সমাজ অবৈধ সন্তানকে পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা দিতে সম্মত নয়।[3] এটা যথেষ্ট নয় যে কোন শিশু তার পিতার নামে পরিচিত। এটা সত্যা হলেও চলবে না, বরং সকল সত্যের উর্ধ্বে এটা সত্য হতে হবে। শিশুকে যেন এ বিষয়ে লজ্জিত হতে না হয়। জাহেলিয়া বা অজ্ঞতার যুগে সন্দেহজনক পিতৃত্ব নিয়েও কোন কোন হতভাগ্য শিশুকে চলতে হতো। একাধিক ব্যক্তি একটি শিশুর পিতা ব‡ল দাবী করত এবং দাবীর সমর্থনে যুক্তিও পেশ করত। বিষয়টি রাসুল (সা.) কে অত্যন্ত ব্যাথিত করে। তিনি ঘোষণা করেন ‘‘যে পিতার শয্যায় (বা সংসারে) সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, শিশু সেই শয্যারই।’’[4] ইসলামের বিধান হলো যে পরিবারে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, সন্তান সেই পরিবারের যদি না বিষয়টি চ্যালঞ্জ হয়।





এরূপ একটি সীদ্ধান্ত প্রচলিত আছে যে, বিয়ের ৬ মাসের মধ্যে যে শিশু জন্ম গ্রহণ করে তার জন্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা বৈধ নয়। যদি কোন পিতা তার স্ত্রীর আনুগত্যহীনতার কারণে সন্তানকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিতে না চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই অবিশ্বাস করা যায় না,তাকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। যদি সে সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে লিয়ান[5] পদ্ধতি অবলম্বন করতে হলেও শিশুর পিতার পরিচয় সন্দেহমুক্ত করতে হবে। লিয়ান এর পদ্ধতি সম্পর্কে আল-কুরআনে এরশাদ হয়েছে:





﴿وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ ٱلۡمُحۡصَنَٰتِ ثُمَّ لَمۡ يَأۡتُواْ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَ فَٱجۡلِدُوهُمۡ ثَمَٰنِينَ جَلۡدَةٗ وَلَا تَقۡبَلُواْ لَهُمۡ شَهَٰدَةً أَبَدٗاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ مِنۢ بَعۡدِ ذَٰلِكَ وَأَصۡلَحُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٥ وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ أَزۡوَٰجَهُمۡ وَلَمۡ يَكُن لَّهُمۡ شُهَدَآءُ إِلَّآ أَنفُسُهُمۡ فَشَهَٰدَةُ أَحَدِهِمۡ أَرۡبَعُ شَهَٰدَٰتِۢ بِٱللَّهِ إِنَّهُۥ لَمِنَ ٱلصَّٰدِقِينَ﴾ [النور: 6- 9]





‘‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ উত্থাপন করে, অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের (প্রয়োজনীয় সংখ্যক) সাক্ষী নাই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে (স্বামী) আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী এবং পঞ্চম বারে বলবে, সে মিথ্যাবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়বে। তবে স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে যদি সে (স্ত্রী) আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী মিথ্যাবাদী, এবং পঞ্চম বারে বলবে, তার স্বামী সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়বে।’’[6]





সুন্দর নাম পাবার অধিকার





নাম একটি জাতির স্বকীয়তা ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হাজলিটের (William Hajlitt) সাবলীল বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:





A mane fast anchored in the deep abyss of time is like a star twinkling in the firmament cold, distant, silent, but eternal and sublime.”[7]





নাম কালের অতল তলে আবদ্ধ নোঙর, যেন দূর নীলিমায় মিটিমিটি তারকা, শান্ত, সুদূর সমাহিত; কিন্তু শাশ্বত সুউন্নত। একটি সুন্দর বা উত্তম নাম পাওয়া প্রতিটি সন্তানের পিতা-মাতা তার হক বা অধিকার হিসেবে শরিয়ত স্বীকৃতি দেয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)এ প্রসঙ্গে এক হাদীস উল্লেখ করেন:





রাসূল (সা) বলেছেন, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হক হচ্ছে প্রথমত: তিনটি





1. জন্মের পরে তার জন্য একটি উত্তম নাম রাখতে হবে।





2. জ্ঞান বুদ্ধি হলে তাকে উত্তম শিক্ষা দিতে হবে।





3. পূর্ণবয়স্ক হলে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।[8]





ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে তিনি বলেন, তারা বললো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা অবগত হয়েছি যে, পিতার হক কি; কিন্তু সন্তানের হক কি? তিনি বললেন, পিতা (সন্তানকে) সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা প্রদান করবে।[9]





ইবন আববাস ও আবু সাঈদ (রা.) অন্যত্র বর্ণনা করেন-রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, যার সন্তান জন্মগ্রহণ করে সে যেন সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা দেয় এবং সাবালক হলে তার বিয়ে দেয়।[10]





ইসলামে নামের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাওআলা প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম তাকে নামই শিক্ষা দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:





﴿وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِ‍ُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣١﴾ [البقرة: 31]





‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমুদয় ফিরিশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও।’[11] পরবর্তী আয়াতে দেখা যায় এরপর ফেরেস্তাদের কাছে এ সকল জিনিসের নাম জানতে চাইলে তারা অজ্ঞতা প্রকাশ করে। তখন আদম (আ.)কে জিজ্ঞাস করলে তিনি তা বলে দেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাওআলা আদম (আ.) কে ফেরেস্তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।[12] নামের গুরুত্ব বুঝা যায় যখন সকল কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণের নির্দেশ আসে। এর মধ্যে কিছু কাজ আছে যা আল্লাহর নামে শুরু করা ফরজ। যেমন, সালাত, তায়াম্মুম ও পশু যবেহ ইত্যাদি। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ এসেছে এভাবে:





‘‘আপনি আপনার প্রতিপালকের নাম স্বরণ করুণ এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন থাকুন।[13] তাফসীরকারদের মতে এ আয়াতে তাকবীরে তাহরীমার কথা বলা হয়েছে, যার আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা ফরজ। শুধু কি কাজের আগেই বরং পবিত্র কুরআনে নাযিলকৃত প্রথম আয়াতের নির্দেশও ছিল মহান আল্লাহ্ তাআলার নামে পাঠ করার। যেমন এরশাদ হয়েছে:





﴿ ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ﴾ [العلق:8]





‘‘পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে।[14] এতে বুঝা গেল যে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ ফরজ। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহর নাম উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হাদীস শরীফের সূত্রে আহকামুল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- খাবার সময় বান্দাহ যদি আল্লাহর নাম উচ্চরণ করে, তাহলে শয়তান তার সাথে খেতে বসতে পারে না। আর নাম উচচারণ না করলে অবশ্যই তার খাবারে শয়তান শরীক হবে। মুশরিকরা তাদের কাজ-কর্ম শুরু করে তাদের দেব-দেবী মূর্তির নামে, যাদের তারা পূজা করে, ওদের বিরোধিতা করা হবে যদি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কাজ শুরু করা হয়।[15]





সুতরাং নাম কোন ক্ষুদ্র বিষয় নয়, যে রাখতে হয় তাই রাখা। বরং এর মাধ্যমে পরিচয়ের এক শাশ্বত ধারার সূচনা ঘটে। ফলে বিশ্ব মণীষীরাও নামের গুরুত্ব না দিয়ে পারে নি। কিন্তু তা অর্থবোধক, শ্রুতিমধুর বা অন্য কোন আঙ্গিকে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে মতান্তরের অবকাশ লক্ষ করা যায়। সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে মুসলমানদের গাফলতির সুযোগ নেই। তাই শিশুকে সার্বিক দিক থেকে সুন্দর নাম দিতে হবে। যে ধরনের নাম নিয়ে অন্যরা হাসাহাসি করে, সে ধরনের নামে শিশুকে ডাকা যাবে না। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন: ‘‘তোমরা সুন্দর নাম রাখ।’’[16]





বেঁচে থাকার অধিকার





ইসলামে শিশু হত্যা নিষিদ্ধ। তা দরিদ্রতার ভয়, পারিবারিক সুনাম-সম্মান রক্ষা করা অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন। জাহেলিয়াত যুগে আরব দেশে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। এ ধরণের অমানবিক প্রথাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দা এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:





﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ﴾ [الأنعام :151]





দারিদ্রতার কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমি তোমাদেরকে এবং তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি।’’[17] অন্যত্র বলা হয়েছে:





﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُمۡ خَشۡيَةَ إِمۡلَٰقٖۖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُهُمۡ وَإِيَّاكُمۡۚ إِنَّ قَتۡلَهُمۡ كَانَ خِطۡ‍ٔٗا كَبِيرٗا﴾ [الإسراء:31]]





দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি রিযিক দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।[18] যে সন্তান প্রসবিত হয়নি, দুনিয়ার আলো দেখেনি মাতৃগর্ভে থাকা কালেও তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। ভ্রুণে জীবন এসে গেলে তাকে হত্যা করা যাবে না। কারো কারো মতে ৪০ দিনে জীবন আসে কারো কারো মতে ৪ মাসে। জীবন এসে গেলে গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম। কোন কোন ফকীহ বা আইনবিদের মতে যৌনমিলনের ফলে ভ্রুণ সৃষ্টি হলে গর্ভপাত হারাম।[19]





সুস্থতার অধিকার





প্রত্যেকটি মানব শিশুরই সুস্থ শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করার মানবিক অধিকার রয়েছে। কথা খুবই স্বাভাবিক যে, একজন পুষ্টিহীন মা কখনই সুস্থ শিশুর গর্বিত মা হতে পারে না। এ জন্যে মায়ের পুষ্টির ব্যাপারে অতিরিক্ত যত্ম নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া গর্ভস্থিত ভ্রুণের ঠিকমত গঠন ও বৃদ্ধির জন্য মাকে সুষম ও বাড়তি খাবার দিতে হবে। এ বাড়তি খাবার মায়ের স্বাভাবিক খাদ্য হতে ২০০ থেকে ৩০০ ক্যালোরী বেশী যোগাবার উপযোগী হবে। নিম্নে একজন সাধারণ কর্মক্ষম স্বাভাবিক মহিলা ও গর্ভবতি মায়ের কতখানি খাদ্য গ্রহণ করা উচিত তার একটি তালিকা দেয়া হল:





খাদ্য দ্রব্যের নাম


    





স্বাভাবিক মহিলা


    





গর্ভবতী মহিলা





চাল/ডাল


    





৩৫০ গ্রাম


    





৩৭৫ গ্রাম





ডাল


    





৪০ ’’


    





৬০’’





মাছ/গোশত/ডিম


    





৬০ ’’


    





৬০’’





আলু/মিষ্টিআলু


    





৬০ ’’


    





৬২’’





যেকোন শাক


    





১৫০ ’’


    





১৮০’’





যে কোন সব্জী


    





৯০ ’’


    





৯০’’





চিনি/গুড়


    





---------


    





৩০’’





ফল


    





১টা ৫৫ ’’


    





১টা/ ৫৫’’





তৈল/ঘি


    





৪০ ’’


    





৫০’’





খাদ্য শক্তি


    





২১০০ কিঃ ক্যাঃ


    





২৩৬০ কিঃ ক্যাঃ প্রায়[20]





তাছাড়া রোগগ্রস্ত পিতা-মাতার সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে রোগাক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক অসুস্থ হওয়া পিতা-মাতার জন্য কোন অপরাধ নয়। কিন্তু অসুস্থতার সময়ে যৌনমিলনে অনেক সময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তাছাড়া অবৈধ ও মাত্রাতিরিক্ত যৌনমিলনের ফলেও কতকগুলো রোগে শিশু জন্ম থেকে আক্রান্ত হয়। যৌন আক্রান্ত পিতা-মাতার সন্তান পঙ্গু এবং অন্ধ হলে জন্ম নিতে পারে। এ সম্পর্কে হাদীসের বাণী: কোথায় তোমার বীর্ষ স্থাপন করবে তা চিন্তা-ভাবনা করে স্থির করে নাও। বংশধারা যেন সঠিক হয়।[21] রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে জন্মগত অক্ষমতা সৃষ্টি হতে পারে। তাদের দেহ ক্ষীর্ণকায় ও মেধা নিম্নমানের হতে পারে। এতদ্ব্যতীত যে সমস্ত রোগ পিতা-মাতার থেকে সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত হয় সে সম্পর্কে সতর্কতা অবল্বন করা খুবই জরুরী।[22]





মাতৃদুগ্ধ পান





একটি শিশু আত্মপ্রকাশ করার সাথে সাথেই শাখা যেরূপ তার মূলের প্রতি মুখাপেক্ষী থাকে, শিশুও তার মায়ের প্রতি সে রকম মুখাপেক্ষী থাকে। সে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন রক্তরূপে যে আহার্য গ্রহণ করতো এখনও তাকে অনুরূপ আহার্য গ্রহণ করতে হয়। তবে এ রক্ত আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তাঁর জ্ঞান ও ইচ্ছায় দুগ্ধে পরিণত হয় যা শিশুর শরীর গঠনে প্রয়োজনীয় সকল উপাদানে সমৃদ্ধ। আর এ দুগ্ধ প্রবাহিত মায়ের স্তনে এসে উপনীত হয় এবং শিশু আল্লাহর বিশেষ দিক নির্দেশ তার সন্ধান প্রাপ্ত হয়ে চুষতে থাকে। আল-কুরআনে এমন সব নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা মাতৃদগ্ধদানের বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করে এবং মা ছাড়া অন্য মহিলার স্তন থেকে দুগ্ধপান করার ক্ষেত্রে তার দুগ্ধদান সম্পর্কিত নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এরশাদ করেন:





﴿وَٱلۡوَٰلِدَٰتُ يُرۡضِعۡنَ أَوۡلَٰدَهُنَّ حَوۡلَيۡنِ كَامِلَيۡنِۖ لِمَنۡ أَرَادَ أَن يُتِمَّ ٱلرَّضَاعَةَۚ ﴾ [البقرة: 233]





‘‘যে জননী সন্তানদেরকে পুরো সময় পর্যন্ত দুগ্ধপান করতে ইচ্ছে রাখে, তাঁরা নিজেদের শিশুদের পুরো দু’বছর ধরে দুগ্ধ পান করাবে।’’[23] এ আয়াত দ্বারা স্তন্যদান সংক্রান্ত নিম্নোক্ত দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়:





এক. শিশুকে স্তন্যদান মাতার জন্য ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকলে মা যেন তাঁর সন্তানকে তার স্তন্যপান থেকে বঞ্চিত না করে, ক্রোধের বশর্বতী হয়ে বা অসন্তুষ্টির কারণে শিশুকে স্তন্যদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়।[24] বিবাহ বন্ধনে থাকাকালীন স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে স্তন্যদানের জন্য কোন প্রকার বেতন বা বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে না। তবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বা স্তন্যদানে নিয়োগকৃত ধাত্রী বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে।[25]





দুই. উক্ত আয়াতে স্তন্যদানের সময়সীমা দু’বছরের কথা বলা হয়েছে। ইমাম শাফয়ী, সাবেবাইন’ [26]স্তন্য দানের সময়সীমা দু’বছর বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম যুফারের একমত স্তন্যদানের সময়সীমা আড়াই বাছর বা ত্রিশ মাস বলা হয়েছে।[27] তারা তাদের মতের পক্ষে আল্লাহ তা’আলার দলীল হিসেবে পেশ করেছেন:





﴿وَفِصَٰلُهُۥ ثَلَٰثُونَ شَهۡرًاۚ﴾ [الأحقاف:15]





‘‘তার গর্ভ ও দুধপান করানোর সময়কাল ত্রিশ মাস।’’[28] অন্যত্র এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:





﴿وَوَصَّيۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ بِوَٰلِدَيۡهِ حَمَلَتۡهُ أُمُّهُۥ وَهۡنًا عَلَىٰ وَهۡنٖ وَفِصَٰلُهُۥ فِي عَامَيۡنِ﴾ [لقمان: 14]





‘‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে নসিহত করছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে নিজের পেটে বহন করেছে। আর তাকে দুধ ছাড়াতে দুই বছর লেগেছে।’’[29]





তিন: কুরআনের নির্ধারিত সময়সীমা তথা দুবছর পূর্ণ হওয়ার আগেও কেউ চাইলে দুধ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, তবে এ শর্ত থাকবে যে, এতে স্বামী-স্ত্রী পারস্পারিক আলোচনার পর, দুধ ছাড়িয়ে নিলে দুগ্ধপায়ী শিশুর কোন ক্ষতি হবে না এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআনের বিধান হচ্ছে:





﴿فَإِنۡ أَرَادَا فِصَالًا عَن تَرَاضٖ مِّنۡهُمَا وَتَشَاوُرٖ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِمَاۗ وَإِنۡ أَرَدتُّمۡ أَن تَسۡتَرۡضِعُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُمۡ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡكُمۡ﴾ [البقرة:233]





‘‘যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পারস্পারিক পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে দুধ ছাড়িয়ে নিতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাদের কারো কোন গুণাহ হবে না।’’[30] রাসূল (সা) শিশু অধিকারের কথা চিন্তা করে মাতৃদুগ্ধ পানকালে স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। যেমন- এরশাদ হয়েছে:





«لقد هممت أن أنهى عن الغيلة حتى ذكرت ان الروم وفارس يصنعون ذلك فلايضر أولادهم.»





‘‘দুগ্ধপায়ী শিশুর মায়ের সাথে স্বামীর সহবাস আমি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু পারস্য ও রোমকদের সম্পর্কে আমাকে জানানো হল যে, তারা এ কাজ করে, তবে তাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না।’’[31]





 



Recent Posts

Сухане чанд бо аҳли х ...

Сухане чанд бо аҳли хирад

Фақат барои ҷавонон д ...

Фақат барои ҷавонон дар Рамазон

Қуръон аз дидгоҳи дон ...

Қуръон аз дидгоҳи донишмандони ғарбӣ

Ҳаёт маҷмуъаи варақҳо ...

Ҳаёт маҷмуъаи варақҳо аст